কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টারের ভাষা (নবম অধ্যায়) ((সংকলিত))

ষষ্ঠ শ্রেণি (মাধ্যমিক) - চারুপাঠ - গদ্য | NCTB BOOK
4.3k
Summary

আমরা বিভিন্ন উপায়ে মতপ্রকাশ করি, যেমন কথা বলা, লেখা, ছবি আঁকা এবং গান গাওয়া। এর মধ্যে কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র এবং পোস্টার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এগুলো নৈতিক দিক প্রর্দশনের পাশাপাশি সমাজের অসংগতির প্রতিবাদ করে এবং অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। নানা আন্দোলনে চিত্রশিল্পীরা এসব মাধ্যমের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করে এবং এটি আন্দোলনের শক্তি বাড়ায়।

বাংলাদেশে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত এ ধরনের চিত্রশিল্পের একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নানা কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার তৈরি হয়েছে, যা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিভিন্ন আন্দোলনের সময় চিত্রশিল্পীরা ভয়ভীতি সত্ত্বেও কাজ করেছেন; যেমন ২০২৪ সালের আন্দোলনে নাম-না-জানা শিল্পীরা ব্যাপকভাবে গ্রাফিতি এবং ব্যঙ্গচিত্র তৈরি করেছেন। এগুলো প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে কাজ করেছে। শেষ পর্যন্ত, এসব শিল্প কাঠামো আমাদের ইতিহাসের সম্পদ এবং নতুন দিনের জন্য আমাদের জাগ্রত করবে।

আমরা নানাভাবে মতপ্রকাশ করি। কথা বলে, লিখে, ছবি এঁকে, গান গেয়ে আরো অনেক উপায়ে আমরা মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি। কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার এরকম কয়েকটি মাধ্যম। এগুলো নির্মল হাসির উপাদান হতে পারে, আবার হাসির মাধ্যমে সমাজের নানা অসংগতিও প্রকাশ করা যায়। শুধু তাই নয়, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর কোনো দেশে যখন বড়ো আন্দোলন হয়, তখন চিত্রশিল্পীরা কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার আঁকার মাধ্যমে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এগুলোকে বলা যায় রাজনৈতিক কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র বা পোস্টার। এগুলো আন্দোলনে শক্তি জোগায় এবং মানুষকে আরো উজ্জীবিত করে।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অনেক বড়ো বড়ো আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। নানা শ্রেণি-পেশা আর মতের মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়। তখন আমাদের চিত্রশিল্পীরাও এগিয়ে এসেছেন। তাঁরা মিছিল-মিটিং করেছেন, অন্যদের সাথে নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। তবে অন্যদের চেয়ে আলাদা একটা কাজও করেছেন তাঁরা কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার এঁকে আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছেন।

একটা কার্টুনের ছোট্ট ছবিতে প্রতিবাদের বা বিদ্রোহের যে প্রকাশ ঘটে, অনেক সময় হাজার কথায় তা প্রকাশ করা যায় না। অনেক সময় কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র বা পোস্টারের ছবি আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। বহু মানুষ তাতে মনের ভাষা খুঁজে পায়। আন্দোলন গড়ে ওঠার জন্য সেগুলো শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বারবার এটা দেখা গেছে। এসব আন্দোলন-সংগ্রামে বহু কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার আঁকা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে অসংখ্য গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ তোফাজ্জল হোসেনের আঁকা একটি কার্টুনে দেখা যায়, একটি গরু ঘাস খাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে, কিন্তু তার দুধ চলে যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে। তখন আমাদের দেশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। আমাদের দেশকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা শোষণ করতো। শোষণের কথাটা তিনি এভাবে প্রকাশ করেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিতুন কুণ্ডুর আঁকা একটি পোস্টার 'সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী' বিভিন্ন স্থানে লাগানো দেখলে সাধারণ মানুষ আশার আলো দেখতে পেত, আর পাকিস্তানি সৈন্যরা ভয় পেত।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের আগে 'দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে' শিরোনামে একটা ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছিলেন পটুয়া কামরুল হাসান। সেটা তখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটি ছবি আর একটিমাত্র বাক্য দেশের মানুষের জন্য অসাধারণ প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল।

গণবিরোধী শাসকেরা কার্টুন আঁকার জন্য অনেক সময় শিল্পীদের নির্যাতন করে, জেলখানায় বন্দি করে রাখে, এমনকি হত্যাও করে। এইসব ভয়ভীতি উপেক্ষা করেও অনেক চিত্রশিল্পী ছবি ও কার্টুন আঁকেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে একটি কার্টুনের শিরোনাম লিখেছিলেন বলে লেখক মুশতাক আহমেদকে জেলখানায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের সময় চিত্রশিল্পী দেবাশিস চক্রবর্তী অনেক কার্টুন ও পোস্টার এঁকেছেন। এগুলো গণঅভ্যুত্থানের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নাম-না-জানা শিল্পীরাই সবচেয়ে বেশি কার্টুন আর ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছেন। আন্দোলন চলার সময়ে এঁকেছেন, আন্দোলনের পরেও এঁকেছেন। সবচেয়ে বেশি এঁকেছেন সারাদেশের দেয়ালে। এগুলোকে গ্রাফিতি বলা হয়। এর পাশাপাশি শিল্পীরা বিপুল ব্যঙ্গচিত্র ও মিম প্রচার করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। স্বৈরশাসক সবার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল, কিন্তু কার্টুন-ব্যঙ্গচিত্র আর পোস্টার-মিমের মধ্য দিয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলা সম্ভব হয়েছিল। সারা দেশের দেয়াল জুড়ে আঁকা অসংখ্য গ্রাফিতি হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা।

তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ শুধু লিখে বা কথা বলে নয় ছবি এঁকে, গান গেয়ে, এমনকি নৃত্য করেও করা যায়। এদেশের মানুষ যুগে যুগে নানা আন্দোলন-সংগ্রামে এমন প্রতিবাদ করেছেন। এইসব কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার তাই আমাদের ইতিহাসের সম্পদ। এগুলো আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখবে, নতুন দিনের নতুন প্রয়োজনে আমাদের নতুনভাবে জাগিয়ে তুলবে।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

বাংলাদেশে স্বৈরাচারের শাসনের সময় একজন শিল্পী শোষণের দিকগুলো মানুষকে জানাতে একটি গান লেখেন ও গেয়ে প্রচার করেন। পরে স্বৈরাচার সরকারের নির্দেশে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

উদ্দীপকটি দেখে প্রশ্নের উত্তর দাও
উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

শব্দার্থ ও টীকা

371

ব্যঙ্গচিত্র - বিশেষ ধরনের কার্টুন।
গণঅভ্যুত্থান - সর্বস্তরের মানুষের যে আন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসকরা ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বা দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
গ্রাফিতি - দেয়ালে আঁকা, লেখা বা ছবি, যা শোষকের বিরুদ্ধে জনতার মনের ভাব প্রকাশ করে।
স্বৈরাচার - স্বেচ্ছাচার, ইচ্ছামত আচরণ।
খপ্পর - ফাঁদ, কবল।
পটুয়া - পটচিত্র আঁকে যে, চিত্রকর।

Content added By

পাঠের উদ্দেশ্য

337

লেখাটি পাঠ করে শিক্ষার্থীরা গণবিরোধী শাসকের বিরুদ্ধে শিল্পীদের প্রতিবাদের ভাষা সম্পর্কে জানতে পারবে। কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র, পোস্টার ও গ্রাফিতির মতো শৈল্পিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবে।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

275

শাসকশ্রেণি যখন স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে তখন সকল শ্রেণির মানুষের মতো চিত্রশিল্পীদের মনেও বিদ্রোহ জাগে। জনতার সঙ্গে মিছিল-সমাবেশে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার আঁকার মাধ্যমে তাঁরা গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের এ সকল চিত্রকর্ম আন্দোলনে শক্তি যোগায় এবং মানুষকে সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনায় উজ্জীবিত করে তোলে। বাংলাদেশের নিকট-ইতিহাসে তিনটি গণঅভ্যুত্থান সংঘঠিত হয়েছে প্রথমটি ১৯৬৯ সালে, দ্বিতীয়টি ১৯৯০ সালে এবং তৃতীয়টি ২০২৪ সালে। প্রতিটি আন্দোলনেই শিল্পীরা শৈল্পিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে তারা বিভিন্নরকম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চিত্রশিল্পীদের এসব সৃষ্টি ইতিহাসের স্মৃতি যেমন ধরে রাখবে, তেমনি ভবিষ্যতের সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রেরণা হিসেবেও কাজ করবে।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

313

ক. কামরুল হাসানকে কেন 'পটুয়া' বলা হয়?
খ. ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের তিনটি গ্রাফিতির বর্ণনা দাও।
গ. উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ তোফাজ্জল হোসেনের আঁকা কার্টুনটির বক্তব্য কী ছিল?

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...